বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, উত্তরবঙ্গের মাটি উর্বর, মানুষ পরিশ্রমী। উত্তরবঙ্গকে ইচ্ছে করে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। দশ দল ক্ষমতায় এলে উত্তরবঙ্গের চেহারা বদলে যাবে। এই উত্তরবঙ্গ হবে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী।
২৩ জানুয়ারি শুক্রবার পঞ্চগড় জেলার ঐতিহাসিক চিনিকল মাঠে নির্বাচনী জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। দেশের সর্ব উত্তরের এবং হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত জেলা পঞ্চগড় জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মো. ইকবাল হোসাইনের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম।
আরও বক্তব্য রাখেন পঞ্চগড়-২ (বোদা-দেবীগঞ্জ) উপজেলার ১০ দলীয় জোট সমর্থিত ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মো. শফিউল আলম ওরফে সফিউল্লাহ সুফি এবং পঞ্চগড়-১ (সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী) আসনের ১০ দলীয় জোট ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী মো. সারজিস আলম।
অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, জেলা এনসিপির আহ্বায়ক এবিএম জুলফিকার আলম নয়ন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পঞ্চগড় জেলা সভাপতি হাফেজ মীর মোর্শেদ তুহিন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)-এর জেলা সভাপতি মোহাম্মদ মাসুদ, এনসিপি বোদা উপজেলা সমন্বয়কারী শিশির আসাদ, এলডিপি জেলা সাধারণ সম্পাদক আওরঙ্গজেব উজ্জ্বল, ইসলামী ছাত্রশিবির জেলা শাখার সভাপতি মো. রাশেদ ইসলাম, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা মো. দেলোয়ার হোসাইন, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আব্দুল বাসেত প্রমুখ।
মাওলানা হাসানুর রহমানের অর্থসহ কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে জনসভা শুরু হয়। সংগীত পরিবেশন করে ডাহুক সাংস্কৃতিক সংসদ।
আমীরে জামায়াতের উত্তরবঙ্গের প্রথম সমাবেশ শুরু হয় পঞ্চগড়-১ আসনের নির্বাচনী সমাবেশের মাধ্যমে। সমাবেশ শুরুর আগেই ঐতিহাসিক চিনিকল মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। আশপাশের রাস্তায় অবস্থান নিতে দেখা যায় অগণিত মানুষকে। এবার দশ দলের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে বলে অনেককে বলতে শোনা যায়। এরপর আমীরে জামায়াত দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন।
পঞ্চগড়ের নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে উত্তরবঙ্গকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সৎ মায়ের সন্তানের মতো আচরণ করা হয়েছে। এই উত্তরবঙ্গ আমাদের কলিজার অংশ। এই উত্তরবঙ্গ বাংলাদেশকে খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ করে। অঞ্চলটিকে ইচ্ছে করে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। উত্তরবঙ্গে আর কোনো বেকার দেখতে চাই না। আমরা সকলের জন্য মর্যাদার কাজ নিশ্চিত করতে চাই। আমরা প্রত্যেক যুবক-যুবতী ও নাগরিককে দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে দেখতে চাই। গোটা উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী বানাতে চাই। চিনিকল খুলে দিতে চাই। আমাদের কাছে কার্ড নেই—আপনারাই আমাদের ভালোবাসার কার্ড। আপনাদের ভোটে একটি ভালোবাসার কার্ড চাই। আপনাদের সমর্থন ও ভালোবাসা দিয়ে আগামীর বেকারত্ব ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আমরা পরের ধনে পোদ্দারি করবো না। আমরা নারী-পুরুষ মিলে বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। এতদিন আওয়াজ উঠতো টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, এখন থেকে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ আওয়াজ উঠবে।
তিনি উল্লেখ করেন, উত্তরবঙ্গেও চারটি নদী আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে ছিল—তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া। আজ আসতে আসতে দেখলাম নদীগুলো মরে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। নদীগুলো কঙ্গাল হয়ে গেছে। নদীগুলো খুন করা হয়েছে। ওরা বসন্তের কোকিল—বসন্তে এসে কুহু কুহু ডাকে, এরপর আর খোঁজে পাওয়া যায় না। আমরা ছিলাম, আমরা আছি, আমরা থাকবো ইনশাআল্লাহ। আপনাদের ফেলে আমরা কোথাও যাবো না ইনশাআল্লাহ। আপনাদের নিয়ে প্রিয় বাংলাদেশকে গর্বের বাংলাদেশ হিসেবে গড়বো।
আমীরে জামায়াত বলেন, আপনাদের সমর্থন, ভালোবাসা ও ভোটে আমাদের পার্লামেন্টে পাঠালে শুধু নদীর জীবনই ফিরে আসবে না, মানুষের জীবনও প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠবে—উত্তরবঙ্গের চেহারা বদলে যাবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের মাটি উর্বর, মানুষ পরিশ্রমী। ৬৪ জেলায় মেডিকেল কলেজ হবে, পঞ্চগড়েও মেডিকেল কলেজ হবে। আমরা চুরি করা টাকা পেট থেকে বের করে আনবো। আমরা ক্ষমতায় গেলে সর্বশক্তি দিয়ে আপনাদের ঋণ শোধ করবো। সবাই মিলে কাজ করলে এই দেশ উন্নত দেশে পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না—পাঁচ বছরই যথেষ্ট।
তিনি বলেন, আমরা যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করি, তাহলে আর পিছিয়ে থাকবো না। দশ দলীয় জোটের পক্ষে দুইজন প্রার্থীর হাতে প্রতীক তুলে দেন। দেশের মালিক নয়, সেবক হতে চাই। ভোট ডাকাতি করতে এলে রুখে দিতে হবে। যুবকদের উদ্দেশে বলেন, কাজ শেষ হয়নি। অবিচার, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বিদায় দিয়ে ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত থাকবে। আমরা থামবো না। নতুন কোনো দুষ্কৃতকারী নতুন পোশাক নিয়ে আমাদের সামনে যেন আসতে না পারে—সে জন্য মহান প্রভুর সাহায্য কামনা করেন।
আমীরে জামায়াত আরও বলেন, দশ দল ক্ষমতায় এলে দুর্নীতি, দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে ন্যায়-ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।
মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে ডা. শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলামকে প্রয়োজন। বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতে গুলি করার যে স্লোগান উঠেছিল—সেই বাংলাদেশ গড়তে হলে তাঁদের প্রয়োজন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানান এবং সবাইকে ১২ তারিখ ভোট দেওয়ার অনুরোধ করেন।
পঞ্চগড়-২ আসনের প্রার্থী মো. সফিউল আলম বলেন, জুলাই বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল পরিবর্তন। আমরা সারাদেশে পরিবর্তন চাই। সবাই মিলে দেশকে মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আল্লাহ বিজয়ী করলে পঞ্চগড়ে সারের সিন্ডিকেট ভেঙে দেবো। মেডিকেল স্থাপন করবো। সরকারি ভাতাসমূহ গরিবদের মধ্যে বিতরণ করবো। বৈষম্য ও চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দেবো না।
পঞ্চগড়-১ আসনের প্রার্থী মো. সারজিস আলম মঞ্চে উঠে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের স্লোগান দেন। তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন হচ্ছে আগামীর বাংলাদেশ গড়ার ধাপ। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা এগিয়ে যাবো কি না। যারা দিনে এক কথা বলে আর রাতে অন্য সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের রুখে দিতে হবে। সবার সঙ্গে দেখা হবে রাজপথের লড়াইয়ে।
রাশেদ প্রধান বলেন, আমরাই বাংলাদেশ—যে বাংলাদেশে নতুন করে কোনো জালিমের উত্থান হতে দেওয়া হবে না। যারা সংস্কার রুখে দিতে চায়, পাথর দিয়ে মানুষ মারে—তাদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া ঈমানি দায়িত্ব। তিনি বলেন, ১০ দল ক্ষমতায় গেলে পঞ্চগড়ে উন্নত বিশেষায়িত হাসপাতাল হবে, সঙ্গে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও হবে। কৃষকদের সুদ মওকুফ করে দেওয়া হবে।
