১৮ জানুয়ারি ২০২১, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
৪০ বছর বিলম্বের কারণ সরকার পক্ষ দর্শাতে পারেনি : ব্যারিস্টার রাজ্জাক, জামায়াতে ইসলামী রাজাকার আল বদর আল শামস বাহিনী কখনো গঠন করেনি
৯ এপ্রিল ২০১২, সোমবার,
প্রবীণ জননেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ খন্ডন করে প্রদত্ত শুনানির দ্বিতীয় দিনে তার আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী রাজাকার, আল বদর বা আল শামস বাহিনী কখনো গঠন করেনি। ৪০ বছর বিলম্বে কেন অভিযোগ দায়ের করা হলো এর কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ রাষ্ট্র পক্ষ তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় অতিবিলম্বের কারণে এই মামলা চলতে পারে না। তার বিরুদ্ধে যেহেতু সুনির্দিষ্ট কোন অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ নেই। সেহেতু এই মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হোক। পেপার কাটিং ছাড়া তাদের সামনে কোন সাক্ষ্য প্রমাণও নেই। যুদ্ধের ৪০ বছর পরে মামলা বা বিচারের কোন নজীর পৃথিবীর কোথায়ও নেই।
 
গত ২৫ মার্চ ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তার যুক্তি প্রদর্শন শুরু করেন। গতকাল তার অবশিষ্ট শুনানি শেষ করেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপক্ষ আরো কিছু শুনানি করবেন। পরে আদেশ দেয়া হবে।
 
দ্বিতীয় দিনের শুনানি উপলক্ষে বয়োবৃদ্ধ অধ্যাপক গোলাম আযমকে একটি এ্যাম্বুলেন্সে করে গতকাল নিয়ে আসা হয় ট্রাইব্যুনালে। একটি হুইল চেয়ারে করে তাকে ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় তলায় কাঠগড়ায় উঠানো হয়। তার উপস্থিতিতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তার দ্বিতীয় দিনের শুনানি করেন। তিনি বলেন, বিগত ৪০ বছরে কোন থানায় বা আদালতে একটি মামলা বা জিডিও হয়নি যে অধ্যাপক গোলাম আযম কোন অপরাধ করেছেন। এমন কোন অভিযোগও কেউ করেনি। যদি তিনি অপরাধ করতেন তাহলে বিগত ৪০ বছরে মামলা হতো। এতদিন পরে কেন মামলা করা হলো তার কোন যুক্তি প্রসিকিউশন দিতে পারেনি। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ নেই। শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল সদর, আল শামস জামায়াতে ইসলামী দ্বারা গঠিত হওয়ার কোন তথ্যই সঠিক নয়। এসব বাহিনী কোন অক্সিলারী ফোর্সও নয়। অক্সিলারী ফোর্স সেটাই যে ফোর্স সরাসরি সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডে পরিচালিত হয়।
 
দারোগা ছিরু মিয়ার হত্যার নির্দেশ অধ্যাপক গোলাম আযম দিয়েছেন মর্মে প্রসিকিউশন আনীত অভিযোগকে সম্পূর্ণ বানোয়াট উল্লেখ করে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, খামের মধ্যে নির্দেশ একজন বয়ে নিয়ে গেল ঢাকা থেকে। সেই নির্দেশ কার্যকর করলো একটি গ্রুপ তারা কেউই আসামী হলো না, আসামী হলেন গোলাম আযম। এটা কি করে হয়। যারা হত্যা করেছে তারা কোথায়? তাদের কোন বিবরণ নেই। হত্যাকারী তো আগে আসামী। হুকুমদাতা যদি গোলাম আযম হয়েও থাকেন তিনি তো পরের আসামী হবেন। মূল খুনীরা কোথায়, তাদের তথ্য না থাকায় এই মামলাই ভিত্তিহীন।
 
অধ্যাপক  গোলাম আযমের কৌঁসুলী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক শুনানির দ্বিতীয় দিনে ট্রাইব্যুনালের সামনে আরও বলেন, ৪০ বছর পরে যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পূর্ণ নজির বিহীন। নুরেমবার্গ থেকে শুরু করে প্রাক্তন যুগোশ্লাভিয়া, রুয়ান্ডা, সিয়েরালিওন, কম্বোডিয়া এবং হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে এর কোনো নজির নেই। ২৫ তারিখের শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক জানতে চেয়েছিলেন, কম্বোডিয়াতে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কতদিন পর বিচার শুরু হয়েছে? এর উত্তরে গতকাল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কম্বোডিয়াতে যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৭৫ সালে এবং শেষ হয় ১৯৭৯ সালে। কিন্তু গৃহযুদ্ধ চলে দীর্ঘ ১৯ বছর। এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন বছরের মধ্যে ২০০১ সালে জাতিসংঘের সহায়তায় ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় এবং বিচার কার্য শুরু হয়। ব্যারিস্টার রাজ্জাক আরও বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নজির বিহীন বিলম্বের যুক্তিসঙ্গত কারণ ট্রাইব্যুনালের সামনে ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্র পক্ষের। এই পর্যন্ত তারা কোন যুক্তিসঙ্গত বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেনি। তারা যদি যুক্তিসঙ্গত কারণ দর্শাতে ব্যর্থ হন তাহলে এ বিচার কার্য চলতে পারে না। এ পর্যায়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাক ১৯৯৪ সালের বৃটেনের সর্বোচ্চ আদালত ‘‘হাউস অব লর্ডস’’-এর একটি নজির পেশ করেন।
 
ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ যে বিষয়ে ফরমাল চার্জ দাখিল করেছে তার ভিত্তিতে অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের কোনো উপাদান নেই। আইনে বলা আছে, সাক্ষীর নাম বলতে হবে, কোন জায়গাতে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা বলতে হবে এবং কি অপরাধ তিনি করেছেন তারও সুস্পষ্ট বিবরণ আসা প্রয়োজন। এই পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সম্পূর্ণ ব্যর্থ। শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে অধ্যাপক গোলাম আযমের নিছক রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোতেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এই পর্যায়ে তিনি বিভিন্ন দেশের যুদ্ধাপরাধের নজির তুলে ধরে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা যার ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে রাষ্ট্রপক্ষ আইন লঙ্ঘন করেছে।
 
১৯৭৩ সালের আইনের উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রসংঘ কোনোভাবেই অক্সিলারী ফোর্স বা সহায়ক বাহিনীর সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না। জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক দল এবং ইসলামী ছাত্রসংঘ ছিল একটি ছাত্র সংগঠন। আইনের বিভিন্ন নজির তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, এমনকি রাজাকারও অক্সিলারী ফোর্স বা সহায়ক বাহিনীর সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে, জামায়াতে ইসলামী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস কখনও গঠন করেনি।
 
১৯৭১ সালের ২ আগস্ট তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সরকার একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাজাকারকে সংগঠিত করে। এই সংগঠনের পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহীও ছিলেন সরকার কর্তৃক নিয়োজিত একজন বেসামরিক ব্যক্তি।