১৮ জানুয়ারি ২০২১, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
জ্যেষ্ঠ এক বিচারপতি ভিন্নমত: কামারুজ্জামানের আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, বৃহস্পতিবার,
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় সাড়ে তিনমাস পর প্রকাশ হয়েছে।আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে পুর্নবিবেচনা (রিভিউ)আবেদন করবেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি হাতে পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে এই রিভিউ দাখিল করতে হবে।
গতকাল বুধবার বিকালে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে রায়টি প্রকাশ করা হয়। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ চার বিচারপতির স্বাক্ষর শেষে রায়টি প্রকাশ করা হয়। বেঞ্চের অপর তিন বিচারপতি হলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী। এরমধ্যে জ্যোষ্ঠ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা রায়ে ভিন্নমত পোষন করেছেন। পুর্নাঙ্গ রায়টি ৫৭৭ পৃষ্ঠার।রায়ের ৫৭৬ পুষ্ঠায় সংক্ষিপ্ত আদেশ রয়েছে। পুর্নাঙ্গ রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশে বলা হয়েছে-আপিল আংশিকভাবে মঞ্জুর হলো। আপিলকারী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে প্রথম অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হলো। ২ ও ৭ নম্বর অভিযোগে তার দন্ড সংখ্যারিষষ্ঠতার ভিত্তিতে বহাল থাকলো।৩ অভিযোগে তাকে সর্বস্মতভাবে দোষীসাব্যস্ত করা হলো তবে মৃদ্যুদন্ড দেয়া হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে।৪ অভিযোগে সথ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তার সাজা মৃত্যুদন্ড থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হলো।
জ্যোষ্ঠ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা রায়ে বলেছেন আপিল আংশিকভাবে মঞ্জুর হলো। ২, ৪ এবং ৭ নম্বরঅভিযোগেআপিলকারী দোষী না হওয়ায় (মুহাম্মদ কামারুজ্জামান) খালাস দেয়া হলো। ৪ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যৃদন্ডের স্থলে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হলো। ২ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে ব্যর্থ। কারণে দোষী প্রমাণিত না হওয়ায় অভিযুক্তকে খালাস দেয়া হলো। ৩ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদন্ডের আদেশ সংশোধন করে যাবজ্জীবন সোজা দেয়াই যুক্তিযুক্ত। কারণ ঘটনাস্থলে অভিযুক্তের উপস্থিতি নিয়ে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে। ৪ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। ৭ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে এই অভিযোগটিও প্রসিকিউশন সন্দেহাতীত প্রমাণ করতে পারেনি। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন‘ কামারুজ্জামান কোন কোন দিন সকালে, কোন কোন দিন দুপুরে আবার কোন কোন দিন সন্ধ্যার পর ডাক বাংলোর ক্যাম্পে আসত। যদি তাই হয় তাহলে কিভাবে অভিযুক্ত প্রণিধানযোগ্য আল বদর নেতা হলেন? কিভাবে সাক্ষীরা তাকে দেখেছে এবং ঘটনায় তার সম্পৃক্ততদা রয়েছে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এবিষয়গুলো আরো বিস্তারিত ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা নিতে পারতো। তাই অভিযুক্তকে খালাস দেয়া হলো।
এদিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, আগামী রোববারের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় যাবে, যেখানে সার্টিফায়েড কপি (প্রত্যায়িত অনুলিপি) তৈরি হয়। প্রত্যায়িত অনুলিপি তৈরি হলে ১৫ দিনের মধ্যে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করা যাবে।
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করে দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে আপিল বিভাগের রায় রিভিউর আবেদন করতে পারবেন দন্ডিত ব্যক্তি ও সরকারপক্ষ (প্রসিকিউশন)। সুপ্রিম কোর্টের রুলস অনুযায়ী রিভিউ করতে ৩০ দিনের মধ্যে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রিভিউর আবেদন নিষ্পত্তি হবে। আপিল বিভাগের এই সিদ্ধান্ত কামারুজ্জামানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। গত ২৪ নবেম্বর রিভিউর এই রায় প্রকাশ হয়।
গত বছরের ৩ নবেম্বর আপিল বিভাগের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ও বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার বিচারপতির বেঞ্চ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে সংক্ষিপ্ত আদেশে রায় ঘোষণা করেন।সংক্ষিপ্ত রায়ে প্রসিকিউশনের ৩য় অভিযোগ-শেরপুরের নালিতাবাড়ি উপজেলার সোহাগপুর গণহত্যার অভিযোগে আপিল বিভাগের চার বিচারপতি সর্বসম্মতভাবে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করলেও মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে। চতুর্থ অভিযোগে গোলাম মোস্তফাকে হত্যার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদন্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ডদেন আপিল বিভাগ। দ্বিতীয় ও সপ্তম অভিযোগে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া দন্ড সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে বহাল রাখা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে এক শিক্ষককে নির্যাতনের ঘটনায় ট্রাইব্যুনাল ১০ বছরের কারাদন্ড দিয়েছিল। আর সপ্তম অভিযোগে গোলাপজান গ্রামের পাঁচজনকে হত্যার ঘটনায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। প্রথম অভিযোগে শেরপুরের কালীনগর গ্রামের বদিউজ্জামানকে হত্যার ঘটনায় ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিলেও আপিল বিভাগ তাকে খালাস দিয়েছে এর মধ্যে ৫ ও ৬ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে অব্যাহতি দিয়েছিল। এই দুটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করেনি।আপিল না করায় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
গত বছরের ৯ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে  বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক মো. শাহিনুর ইসলাম মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদন্ডের রায় দেয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে গত বছরের ৬ জুন আপিল করেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান।
চলতি বছরের ৫ জুন এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। এরপর উভয়পক্ষের শুনানি শেষে গত ১৭ সেপ্টেম্বর মুহাম্মদ কামাররুজ্জামানের পক্ষে আপিলের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন তার আইনজীবীরা।
আপিলৈ মামলাটিতে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, এডভোকেট মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও এডভোকেট এস এম শাহজাহান। তাদের সহযোগিতা করেন এডভোকেট মো. শিশির মুনির।অন্যদিকে সরকার পক্ষে শুনানি করেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগের পুলিশের দায়ের করা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুলাই কামারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।
২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রসিকিউশন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পুনরায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। গত বছরের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। এরপর ১৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাব্যুনা-ে২ এ স্থানান্তর করা হয়। ১৬ মে ডিফেন্সপক্ষ এবং ২০ মে প্রসিকিউশনের আইনজীবীরা কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করেন। এর পর ২০১২ সালের ৪ জুন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে হত্যা, নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১২ সালের ১৫ জুলাই থেকে এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খানসহ প্রসিকিউশনের ১৮ জন সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে কামারুজ্জামানের পক্ষে গত ৬ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৫ জন ডিফেন্স সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা হচ্ছেন মো. আরশেদ আলী, আশকর আলী, কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল, বড় ভাই কফিল উদ্দিন এবং আব্দুর রহিম।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি : মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম ইনসান আলী সরকার। স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম- কুমড়ী মুদিপাড়া, ইউনিয়ন-বাজিতাখিলা, থানা ও জেলা-শেরপুর। ১৯৬৭ সালে কামারুজ্জামান জিকে স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। তারপর জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজে আইএসসি’তে ভর্তি হন। ১৯৭২ সালে কামারুজ্জামান নাসিরাবাদ কলেজে থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় ২য় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ঢাকা কিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে তিনি প্রথম শ্রেণীতে এমএ পাস করেন। তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সম্পাদক এবং জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল।