২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, রবিবার, ১২:৩৪

শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম ব্যাংক সুদ কমলেও বিনিয়োগে ভাটা

ব্যাংকগুলোতে অলস টাকা জমলেও ঋণ নেয়ার মতো নতুন উদ্যোক্তা আসছেন না। আগে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেশি হওয়ার কারণ থাকলেও সম্প্রতি এই সুদ হার এখন সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর পরেও নতুন ব্যবসা কিংবা শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে আগ্রহী হচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল ব্যাংক ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা। বর্তমানে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে থাকলেও বাড়ছে না ব্যবসা, বাড়ছে না বিনিয়োগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এখন ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে। তারপরও ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগ বাড়ছে না ।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী এ বিষয়ে জানিয়েছেন, ব্যবসাকে চাঙা কেউ সুদের হার কমায়নি। আমানতের সুদ হার কমার কারণে ঋণের সুদ হার কমেছে। ব্যবসা বা বিনিয়োগ বাড়াতে সুদের হার কমানো হয়েছে বিষয়টি এমন নয়। তিনি মনে করেন, স্বল্প মেয়াদী ঋণে সুদের হার কমলেও দীর্ঘ মেয়াদী ঋণে সুদের হার এখনও ডাবল ডিজিটেই রয়ে গেছে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে বা ব্যবসা বৃদ্ধি করতে বা নতুন ব্যবসা তৈরির ক্ষেত্রে যে ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার সেই ধরনের কোনও উদ্যোগই নেয়া হয়নি। এ কারণে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ হয়নি।

বিজিএমইএ’র সাবেক এই সভাপতি আরো বলেন, ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য সুদহার কমার পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করা জরুরি। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি। অথচ এগুলোর কোনোটির সুবিধাই পাচ্ছে না ব্যবসায়ীরা। অর্থনীতিবিদদের মতে কয়েম মাস আগেও অনেক নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালেও ঋণের সুদ হার বেশি হওয়াতে তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী হতেন না। কিন্তু এখন এই সুদহার কমলেও বিনিয়োগে ভাটা কাটছে না।

দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে এলেও এখনো বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটেনি। চাহিদা বাড়েনি ব্যাংক ঋণের। ফলে ব্যাংকগুলোতে অলস অর্থ জমে পাহাড় হচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে আমানত ও ঋণের অনুপাতের ব্যবধান। ফলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ইতিবাচক ধারায় না আসায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেই চলেছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারনে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা না থাকা আর শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার মতো অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবকেই এর কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পর্যবেক্ষণে বলছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানত প্রবৃদ্ধি সমানতালে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একাধিকবার নির্দেশ দেয়া হলেও উল্টো পথে হাঁটছে অধিকাংশ ব্যাংক। গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও টানা হরতালে অর্থনীতি বিনিয়োগবান্ধব না থাকার কারণে এবং এখনো দীর্ঘমেয়াদী স্থীতিশীলতা না ফেরায় আমানত পাল্লা দিয়ে বাড়লেও বাড়ছে না ঋণ প্রবৃদ্ধি। এ অবস্থার কারণে ব্যাংকগুলো তারল্য নিয়ে হিমশিম অবস্থায় আছে।

এদিকে বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ বছরের বেশি সময় ধরে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার সাড়ে ২১ থেকে সাড়ে ২২ শতাংশে আটকে পড়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক বিমুখ হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ঋণ দেয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর হাতে আছে বাড়তি ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। কিন্তু কেউ ঋণ নিচ্ছেন না। আর এই অলস অর্থের পেছনে সুদ গুণতে গিয়ে নতুন আমানত সংগ্রহেও আগ্রহ দেখাচ্ছে না ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের চেষ্টার ফলে এখন সুদের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এ কারণে ব্যবসায়ীদের খরচও আগের চেয়ে কমছে।’ তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগমুখী হওয়া শুরু করেছেন। ফলে নতুন নতুন ব্যবসাও বৃদ্ধি পাবে।’

আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিরতত পরিস্থিতিতে ২০১২ সালে ব্যাংকগুলো নিজেরা বসে ঋণ ও আমানতে সুদহারে সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেয়। এরপর থেকে ঋণের সুদহার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে গড় সুদহার ১২ শতাংশের ঘরে নেমে আসে। ২০১৩ সালে নেমে আসে ১১ শতাংশের ঘরে। ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তা ১০ শতাংশের ঘরে ছিল। নবেম্বরে প্রথমবারের মতো নেমে আসে সিঙ্গেল ডিজিটে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে।

http://www.dailysangram.com/post/273376