২৬ নভেম্বর ২০১৪, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
আমাদের সম্পর্কে

০১.ইসলামী জ্ঞান চর্চার এক নিখুঁত পরিকল্পনা

০২.উন্নত চরিত্র গঠনের এক মজবুত সংগঠন

০৩.জনসেবা ও সমাজ সংস্কারের এক বাস্তব কর্মসূচি

০৪.জনকল্যাণমুখী আদর্শ রাষ্ট্র ও সরকার গঠনের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন

ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব

আল্লাহ্‌ তা'আলা তাঁর রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কে মূলত যে কাজটি করার জন্য দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন তা কুরআনের তিনটি সূরায় স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন :

"তিনিই সে মহান সত্তা (আল্লাহ) যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও আনুগত্যের একমাত্র সত্য বিধান (দ্বীনে হক) সহ পাঠিয়েছেন, যেন (রাসূল) তাকে (ঐ বিধানকে) আর সব বিধানের উপর বিজয়ী করেন।"

(সূরা আত্‌ তাওবা : ৩৩, সূরা আল ফাত্‌হ : ২৮, সূরা আস সাফ : ৯)

রাসূল (সা.) আল্লাহ্‌র দ্বীনকে কায়েম করেই এ দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, আইন, শাসন, বিচার, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই তিনি আল্লাহ্‌র বিধানকে চালু করে প্রমাণ করেছে যে, ইসলামই দুনিয়ার জীবনে শান্ত্মির একমাত্র উপায়। তাই দ্বীন ইসলাম কায়েমের দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ কাজ। সাহাবায়ে কিরামও রাসূল (সা.)-এর সাথে এ দায়িত্বই পালন করেছেন। মুসলিম হিসেবে আমাদের সবারই এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কর্তব্য। এ দায়িত্ব অবহেলা করে আল্লাহ্‌র সন্ত্মুষ্টি হাসিল করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

জামায়াতবদ্ধ জীবনের গুরম্নত্ব

ইসলাম কায়েমের এ মহান দায়িত্ব একা একা পালন করা নবীর পক্ষেও সম্ভব ছিল না। তাই যারাই নবীর প্রতি ঈমান এনেছেন তাদেরকেই সংঘবদ্ধ করে নবীগণ ইসলামী আন্দোলন করেছেন। যে সমাজে ইসলাম কায়েম নেই সেখানে ব্যক্তি জীবনেও পুরোপুরি মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করা কঠিন। আর আল্লাহ্‌র দ্বীনকে সমাজ জীবনে কায়েম করার কাজ তো জামায়াতবদ্ধভাবে ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়।

নবী করীম (সা.) বলেছেন, মেষের পাল থেকে আলাদা একটি মেষকে যেমন নেকড়ে বাঘ সহজেই ধরে খায়, তেমনি জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন একজন মুসলিম সহজেই শয়তানের খপ্‌পরে পড়ে যায়। তাই

জামায়াতবদ্ধ জীবনই ঈমানের অনিবার্য দাবী।

জামায়াতে ইসলামী কোন ধরনের দল

জামায়াতে ইসলামী প্রচলিত অর্থে শুধুমাত্র ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক দল নয়। ইসলামে ধর্মীয় জীবনের গুরম্নত্ব আছে বলেই জামায়াত ধর্মীয় দলের দায়িত্ব পালন করে। রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া ইসলামী আইন চালু হতে পারে না বলেই জামায়াত রাজনৈতিক ময়দানে কাজ করে। সমাজ সেবা ও সামাজিক সংশোধনের জোর তাকিদ ইসলাম দিয়েছে বলেই জামায়াত সমাজ সেবা ও সমাজ সংস্কারে মনোযোগ দেয়। এ অর্থেই জামায়াতে ইসলামী একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আন্দোলন।

জামায়াতের বুনিয়াদী আকিদা-বিশ্বাস

০১.আল্লাহ্‌ তা'আলাই মানব জাতির একমাত্র রব, বিধানদাতা ও হুকুমকর্তা।

০২. কুরআন ও সুন্নাহ্‌ই মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান।

০৩.মহানবীই (সা.) মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য আদর্শ নেতা।

০৪. ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনই মুমিন জীবনের লক্ষ্য।

০৫. আল্লাহ্‌র সন্ত্মুষ্টি ও আখিরাতের মুক্তিই মুমিন জীবনের কাম্য।

জামায়াতে ইসলামীর সংগঠন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীন ইসলাম কায়েম করতে চায় বলেই সংগঠনের মাধ্যমে যোগ্য লোক তৈরি করছে। ইসলামী সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার কায়েম করতে হলে এ বিরাট কাজের উপযোগী লোক যোগাড় করতেই হবে। এ লোক আসমান থেকে নাযিল হবে না, বা বিদেশ থেকেও আমদানী করা যাবে না। দাওয়াত ও সংগঠনের মাধ্যমে।

বিশ্বনবী (সা.) যেমন লোক যোগাড় করেছিলেন তেমনি জামায়াতে ইসলামী এ দেশের মানুষ থেকেই উপযুক্ত লোক তৈরি করছে।

জামায়াতের ৩ দফা দাওয়াত

কুরআন ও হাদীস থেকে জানা যায়, নবীগণ (আ.) মানুষকে এই বলে দাওয়াত দিয়েছিলেন :

"হে দেশবাসী, একমাত্র আল্লাহ্‌র দাসত্ব কর। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন হুকুমকর্তা (ইলাহ্‌) নেই।"

(সূরা আল আ'রাফ)

শেষ নবীর এ দাওয়াত যারা কবুল করেছেন তারা সবাই এ ঘোষণা দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করেছেন :

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্‌

"আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্‌ নেই, মুহাম্মাদ (সা.)

আল্লাহ্‌র রাসূল।"

জামায়াতে ইসলামী কালেমা তাইয়্যেবার এই ঘোষণাকে

তিন দফা দাওয়াত আকারে পেশ করছে :

১. দুনিয়ায় শান্ত্মি ও আখিরাতে মুক্তি পেতে হলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ্‌ তা'আলাকে একমাত্র ইলাহ্‌ (হুকুমকর্তা) ও মুহাম্মাদকে (সা.) একমাত্র আদর্শ নেতা মেনে নিন।

২. আপনি যদি সত্যি তা মেনে নিয়ে থাকেন তাহলে আপনার বাস্তব জীবন থেকে ইসলামের বিপরীত চিন্ত্মা, কাজ ও অভ্যাস দূর করম্নন এবং আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর বিরম্নদ্ধে কারো আনুগত্য না করার সিন্ধান্ত্ম নিন।

৩. এ দুটো নীতি অনুযায়ী খাঁটি মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করতে চাইলে জামায়াতবদ্ধ হয়ে অসৎ লোকদেরকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্ত্মরে ঈমানদার, আল্লাহভীরম্ন, সৎ ও যোগ্য লোকদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিন।

জামায়াতের ৪ দফা কর্মসূচি

১. দাওয়াতের মাধ্যমে চিন্ত্মার পরিশুদ্ধি ও পুনর্গঠনের কাজ :

জামায়াত কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক শিক্ষাকে বলিষ্ঠ যুক্তির সাহায্যে তুলে ধরে জনগণের চিন্ত্মার বিকাশ সাধন করছে। তাদের মধ্যে ইসলামকে অনুসরণ ও কায়েম করার উৎসাহ ও মনোভাব জাগ্রত করছে।

২. সংগঠন ও প্রশিক্ষণের কাজ :

ইসলাম কায়েমের সংগ্রামে আগ্রহী ব্যক্তিদেরকে সুসংগঠিত করে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার যোগ্য করে গড়ে তুলছে।

৩. সমাজ সংস্কার ও সেবার কাজ :

ইসলামী মূল্যবোধের ভিন্ডিতে সমাজের সংশোধন, নৈতিক পুনর্গঠন ও সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে জামায়াত সমাজের উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধন করছে।

৪. সরকার সংশোধনের কাজ :

জামায়াত শাসন ব্যবস্থার সকল স্ত্মরে অযোগ্য ও অসৎ নেতৃত্বের বদলে আল্লাহভীরম্ন, সত ও যোগ্য নেতৃত্ব কায়েমের জন্য গণতান্ত্রিক পন্থায় চেষ্টা চালাচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর কর্মনীতি :

১.লোক তৈরির কর্মনীতি

ইসলামী সমাজের উপযোগী বলিষ্ঠ ঈমান ও চরিত্র সৃষ্টির জন্য ইসলামী আব্দোলনই একমাত্র উপায়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কায়েমী স্বার্থের বিরম্নদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমেই উপযুক্ত লোক তৈরি হয়। তাই জামায়াত এ পন্থায়ই লোক তৈরি করছে। ত্যাগী ও নিঃস্বার্থ কর্মী এভাবেই তৈরি হয়ে থাকে।

২. সরকার গঠনের কর্মনীতি

হুজুগ, সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে জাতিগঠনমূলক ও সমাজ পরিবর্তনের কাজ হতে পারে না। তাই জামায়াত নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পথেই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায়। ইসলামী আদর্শ জোর করে জনগণের উপর চাপাবার বিষয় নয়। জনসমর্থন নিয়েই ইসলামের সত্যিকার বিজয় সম্ভব।

জামায়াতে ইসলামীর অবদান

১. বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্যের ব্যাপক প্রসার।

২. রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্তিশালী ইসলামী ধারা সৃষ্টি ও জাতীয় রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা পালনে গুরম্নত্বপূর্ণ অবদান।

৩. মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদের যোগ্যতা বৃদ্ধি করে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ ও জনগণের খেদমত করার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

৩. একদল নিষ্ঠাবান, সত ও যোগ্য লোক তৈরী করেছে এবং সততা ও স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত্ম স্থাপন করে যাচ্ছে।

ইসলামের বিজয়ের জন্য শর্ত

আল্লাহ্‌ তা'আলা সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করে ইসলাম কায়েম করেন না। আল্লাহ্‌র খিলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য যারা চেষ্টা করে আল্লাহ্‌ এ কাজে তাদেরকেই সাহায্য করেন। আল্লাহ্‌র যমীনে আল্লাহ্‌রদ্বীন কায়েম করার যোগ্য লোক তৈরি হলে তিনি তাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেন।

- সূরা আন্‌ নূর : ৫৫

আপনি কি ইসলামের বিজয় চান?

আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌র দ্বীনকে বিজয়ী দেখতে চান। তাহলে আসুন জামায়াতে শামিল হোন। নিজেকে ঈমান, ইলম, আখলাক ও আমলে সজ্জিত করম্নন। এ উদ্দেশ্যে জামায়াতে ইসলামী যে কর্মনীতি গ্রহণ করেছে তা আপনাকে এ পথে এগিয়ে দেবে।

জামায়াতে শামিল হওয়ার জন্য

১. প্রথমে সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করম্নন।

২. ইসলামী জ্ঞান ও চরিত্র অর্জনের জন্য সাপ্তাহিক বৈঠকে নিয়মিত হাজির হোন।

৩. পবিত্র কুরআনের তাফসির, হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য এবং পত্র -পত্রিকা ভাল করে পড়ুন।

৪. ইসলামের যতটুকু ইলম হাসিল হয় সে অনুযায়ী আমল করম্নন এবং বিবেকের বিরম্নদ্ধেত্র কোন কাজ না করার মজবুত সিদ্ধান্ত্ম নিন।

৫. যোগ্যতার সাথে দ্বীনী দায়িত্ব পালন করতে হলে জামায়াতের সদস্যপদ গ্রহণ করম্নন।

ইসলামী আন্দোলনের বাহন হচ্ছে সংগঠন। সংগঠন বা সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া কোন আন্দোলনই সফলকাম হতে পারে না। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন সংগঠনের মাধ্যমে একদল সৎ, যোগ্য লোক তৈরী করেছেন তেমনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নীতি অনুসরণে এ দেশের মানুষ থেকেই এক দল সৎ, যোগ্য ও দেশ প্রেমিক লোক তৈরী করতে চায়। এ কাজই জামায়াতে ইসলামীর কাজ। এ কাজকে সন্তোষজনকভাবে ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাধা করার উদ্দেশ্যেই জামায়াত এর উপযোগী ৪ দফা বিজ্ঞান সম্মত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সংগঠন পদ্ধতি বইটি মূলত জামায়াতের ৪ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের পদ্ধতিগত বিষয় সমূহেরই সমষ্টি। নৈতিক ও গণতান্ত্রিক নীতিমালা ঠিক রেখে পরিবেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে এসব পদ্ধতি ও কৌশলে পরিবর্তন আসতে পারে। আমাদের প্রতিটি সংস্করণে এ বাস্তবতার কারণেই পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে যুগ উপযোগী কর্মপন্থা নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৯ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধন ও পরিবর্তন হওয়ায় বইটির ৯ম সংস্করণ সংশোধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।

বিস্তারিত জানতে ডাউনলোড করুন আমাদের প্রকাশনা পেজ থেকে : লিংক
যেহেতু আলাহ ব্যতীত নিখিল সৃষ্টির কোন ইলাহ নাই এবং নিখিল বিশ্বের সর্বত্র আলাহর প্রবর্তিত প্রাকৃতিক আইনসমূহ একমাত্র তাঁহারই বিচক্ষণতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্বের সাক্ষ্য দান করিতেছে; যেহেতু আলাহ মানুষকে খিলাফতের দায়িত্ব সহকারে পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন এবং মানব রচিত মতবাদের অনুসরণ ও প্রবর্তন না করিয়া একমাত্র আলাহ প্রদত্ত জীবন বিধানের অনুসরণ ও প্রবর্তন করাকেই মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন; যেহেতু আলাহ তাঁহার প্রদত্ত জীবন বিধানকে বাস্তব রূপদানের নির্ভুল পদ্ধতি শিক্ষাদান ও উহাকে বিজয়ী আদর্শ রূপে প্রতিষ্ঠিত করিবার উদ্দেশ্যে যুগে যুগে নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছেন; যেহেতু বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুলাহ (সালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম) আলাহর সর্বশেষ নবী ও রাসূল এবং আলাহর প্রেরিত আল-কুরআন ও বিশ্বনবীর সুন্নাহই হইতেছে বিশ্ব মানবতার জীবনযাত্রার একমাত্র সঠিক পথ সিরাতুল মুস্তাকীম; যেহেতু ইহকালই মানব জীবনের শেষ নয় বরং মৃত্যুর পরও রহিয়াছে মানুষের জন্য এক অনন্ত জীবন যেখানে মানুষকে তাহার পার্থিব জীবনের ভাল ও মন্দ কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হইবে এবং সঠিক বিচারের পর জান্নাত বা জাহান্নাম রূপে ইহার যথাযথ ফলাফল ভোগ করিতে হইবে; যেহেতু আলাহর সন্তুষ্টি অর্জন করিয়া জাহান্নামের আযাব হইতে নাজাত এবং জান্নাতের অনন্ত সুখ ও অনাবিল শান্তি লাভের মধ্যেই মানব জীবনের প্রকৃত সাফল্য নিহিত; যেহেতু আলাহর বিধান ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি দিক ও বিভাগে প্রতিষ্ঠিত করিয়াই মানুষ পার্থিব কল্যাণ ও আখিরাতের সাফল্য অর্জন করিতে পারে; যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ এবং বাংলাদেশের জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়া বাংলাদেশ বিশ্বেও মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করিয়াছে; সেহেতু এই মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে ইসলামী সমাজ গঠনের মহান উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর এই গঠনতন্ত্র প্রণীত ও প্রবর্তিত হইল। 

বিস্তারিত জানতে ডাউনলোড করুন আমাদের প্রকাশনা পেজ থেকে : লিংক

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভূখণ্ডীয় সার্বভৌমত্ব ও ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষার প্রতিজ্ঞা নিয়ে কাজ শুরু করে। সূচনা লগ্ন থেকে জামায়াতে ইসলামী আল্লাহর সন্তোষ অর্জন এবং পরকালীন মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত, রাসূল (সা) প্রদর্শিত বিধান মোতাবেক কাজ করে যাচ্ছে।
 

জামায়াতে ইসলামী অভ্যান্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ ও বহিঃশক্তির হুমকি বা আক্রমন প্রতিহত করার লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য সুসংহত করণ ও ইসলামী মূল্যবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে জামায়াতে ইসলামী গনতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকরণ, ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম, মানবাধিকার রক্ষা এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একদল দায়িত্বশীল নাগরিক এবং সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরীর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
 

জামায়াতে ইসলামী বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব শক্তিশালীকরণ এবং পারষ্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে বিশ্বের সকল দেশের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্টা করতে আগ্রহী।

ইসলামের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার জন্য জামায়াতে ইসলামী সকল নাগরিকদের মাঝে ইসলামের বাস্তব ছবি তুলে ধরা, তাদের চিন্তাধারা পবিত্র করা, তাদের হৃদয় ও মনে বাস্তব জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামের অনুসরণের গুরুত্ব সম্পর্কে চেতনা জাগ্রত করার চেষ্টা করছে। জামায়াতে ইসলামী ন্যায়বান ব্যক্তিদের সংগঠিত করার এবং তাদের দক্ষ ব্যক্তিত্বে উন্নীত করার কাজ করছে।
 

জামায়াতে ইসলামী শান্তিপূর্ণ এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে একটা পরিবর্তন আনয়ন করার লক্ষ্যে জীবনের সব স্তরে প্রতিশ্র“তিরক্ষাশীল নেতৃত্ব গড়ার চেষ্টা করছে।

জামায়াতে ইসলামী এর অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক নির্বাচনে গণতন্ত্র চর্চা করে। এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব এর সদস্যদের ভোট দ্বারা নির্ধারিত হয়, যারা নেতৃবৃন্দের সততা, দক্ষতা এবং সাংগঠনিক বিচক্ষণতার দিকে দৃষ্টি রেখে তাদের ভোট দেন।

|| কাজী সাইদ ||
কলকাতা হাইকোর্ট ২১ নভেম্বর ১৯৯৬ সালে সব ধর্মের উপাসনালয়ে লাউড স্পিকার নিষিদ্ধ করে এক রুলিং জারি করেছিলেন। জাস্টিস ভগবতী প্রসাদ ব্যানার্জি ও জাস্টিস এ কে চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ তাদের রুলিংয়ে নির্দেশ দেন, যেহেতু ভারত একটি সেকুলার রাষ্ট্র; তাই ‘শব্দদূষণ’ নিয়ন্ত্রণের জন্য এ নিষেধাজ্ঞা সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর প্রযোজ্য। সে বছর ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় কলকাতার দমদম এয়ারপোর্টের এক নম্বর গেট সংলগ্ন মসজিদে এক মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয় যাতে লাউড স্পিকার ব্যবহৃত হয়েছিল। খবর পেয়ে স্টেট পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের কর্মকর্তারা সেখানে হাজির হন। তারা দেখতে পান মাইক সিস্টেমের শব্দের মাত্রা ৮৫ ডেসিবল। আদালত কর্তৃক নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৬৫ ডেসিবল। আদালত সেই মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন। ৩১ জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে মসজিদ কমিটিকে দোষী সাব্যস্ত করে ২৫০০ রুপি জরিমানা করেন এবং জরিমানার টাকা পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের হিসাবে জমা করতে নির্দেশ দেন। একই অপরাধে হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশ কিছু পূজা উদযাপন কমিটিকেও ১০০০ রুপি করে জরিমানা করা হয়। ৬ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু মুসলমান, শিখ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নেতাদের নিয়ে এক সভা করেন। তিনি তাদের হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে চলতে অনুরোধ করেন। এ সভায় মুসলিম সম্প্রদায়ের পে নাখোদা মসজিদের মাওলানা মোহাম্মদ সাব্বির, সোলানা মসজিদের মাওলানা মোহাম্মদ কাইউম এবং স্টেট ওয়াকফ বোর্ডের সদস্য মাওলানা মাসুদী অংশ নেন। মুসলিম ধর্মীয় নেতারা আজান প্রচারের জন্য লাউড স্পিকার ব্যবহারের অপরিহার্যতা ব্যাখ্যা করেন এবং প্রয়োজনে এ আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দেন, মসজিদের ওপর কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় হস্তপে সহ্য করা হবে না। মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কুরআন নিষিদ্ধকরণের দাবিতে চন্দমল চোপড়া, হেমাংশু কুমার চক্রবর্তী ও শীতল সিং ২৯ মার্চ ১৯৮৫ ভারতীয় সংবিধানের ২২৬ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। ১৭ মে জাস্টিস বিমল চন্দ্র মামলাটি খারিজ করে দেন। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম সর্বশেষ সংশোধনীসহ অক্টোবর ২০১১ সালে মুদ্রিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের শুরু হয়েছে:- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম (দয়াময়, পরম দয়ালু, আল্লাহর নামে)/পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে। এ বন্দনার পরেই রয়েছে প্রস্তাবনা। অনুচ্ছেদ ২(ক)তে বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।” সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘ধর্মনিরপেতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’ প্রসঙ্গে অনুচ্ছেদ ১২তে বলা হয়েছে, “ধর্মনিরপেতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্বপ্রকার সাপ্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, (ঘ) কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার ওপর নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে।’’ সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ‘মৌলিক অধিকার’ অধ্যায়ে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:- অনুচ্ছেদ ৪১ (১) আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা-সাপেে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে; (খ) প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন, রণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রহিয়াছে। ৪১ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:- ‘কোনো শিাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানকারী কোনো ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মসংক্রান্ত না হইলে তাহাকে কোনো ধর্মীয় শিাগ্রহণ কিংবা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনালয়ে অংশগ্রহণ বা যোগদান করিতে হইবে না।’ আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের মুদ্রণ ও প্রকাশনা শাখা থেকে মুদ্রিত এ সংবিধানের শুরুতে সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদের ২০-১০-২০১১ এর একটি উপক্রমণিকা ছাপা হয়েছে। এতে তিনি দাবি করেছেন, ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধন) আইন, ২০১১-এর মাধ্যমে ১৯৭২ সালে গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত, সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ মূল চেতনা অর্থাৎ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেতা ও জাতীয়তাবাদ ফিরিয়া আসিয়াছে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পালনে সমান অধিকার ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করা হইয়াছে।’ মেজর জলিলের অভিমত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অকুতোভয় বীরসেনানী মেজর এম. এ. জলিল তার অরতি স্বাধীনতাই পরাধীনতা গ্রন্থে ’৭২ এর সংবিধানের মূল চারটি স্তম্ভ সম্পর্কে তীব্র সমালোচনা করেছেন। ‘আওয়ামী লীগের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির উৎস’ অধ্যায়ে তার বক্তব্য, ‘১৯৭০ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ছয় দফার ভিত্তিতে। এই ছয় দফার মধ্যে আওয়ামী লীগ গৃহীত চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির একটিরও উল্লেখ ছিল না। তা ছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ আরও উল্লেখ করেছিল যে, তারা ইসলাম ধর্মবিরোধী কোনো আইনকানুনও পাস করবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ’৭২ সালের জানুয়ারিতে মতাসীন হওয়ার সাথে সাথেই ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে দেয় এবং গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেতা ও জাতীয়তাবাদের নামে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি নির্ধারণ করে, যা পরবর্তী সময়ে ’৭২ সালের রাষ্ট্রীয় সংবিধানেও সন্নিবেশিত করা হয়। এই চার মূলনীতির উৎস কোথায়? কেনই বা ওই চার নীতিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হলো? এ প্রশ্নগুলোর জবাব জনগণ আজো পায়নি। যে আওয়ামী লীগ ‘১৯৭০ সালের নির্বাচনে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী কোনো আইন পাস না করার প,ে সেই আওয়ামী লীগই ভারত থেকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গুটিয়ে নিয়ে এসে মতার মসনদে বসার সাথে সাথেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করল কেন? স্বেচ্ছাচারমুক্ত হতে পারল না কেন? দেশের জনমতের কোনোরূপ তোয়াক্কা না করেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব জনগণের ওপর জবরদস্তিভাবেই চাপিয়ে দিলো।’ তার বক্তব্য, ‘১৯৭০ সালে নির্বাচন ছিল পাকিস্তান কাঠামোর আওতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচন। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদসদস্যরা জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করেছিল পাকিস্তানের অধীনে, নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অধীনে নয়। সুতরাং ’৭২ এ আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংবিধান প্রদান নীতিগত দিক দিয়ে মোটেও বৈধ ছিল না।’ তার ভাষায়, ‘‘১৯৭২-এর আওয়ামী লীগের এমন কোনো বৈধ অধিকার ছিল না, যাতে করে তারা দেশ ও জাতির ওপর একটি মনগড়া সংবিধান আরওপ করতে পারে। তবুও তারা তা জবরদস্তি করেছে। দেশের জনগণের চিৎকার, প্রতিবাদ কোনো কাজেই আসেনি। এটা তাদের দুঃসাহস কিংবা ঔদ্ধত্য ছিল না, আওয়ামী লীগের এই আচরণ ছিল মুরব্বির আদেশ-নির্দেশ পালন করার বাধ্যবাধকতা। কারণ এ কথা সর্বজনবিদিত যে, বাংলাদেশের ’৭২ এর সংবিধানের মূল প্রেরণা ভারতের সেকুলার সংবিধান। ’৭২-এর সংবিধানের উৎস তাই বাংলাদেশের জনগণ নয়, সম্প্রসারণবাদী এবং সাম্প্রদায়িক ভারতীয় শাসকচক্রই হচ্ছে এর মূল উৎস।” সংবিধানে ধর্মনিরপেতা স্থাপনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মেজর জলিলের বক্তব্য, “বাংলাদেশের মূল সংস্কৃতি হচ্ছে ইসলামভিত্তিক, কারণ ইসলামই হচ্ছে শতকরা ৯০ ভাগ জনগণের ধর্ম এবং এই ধর্মকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবন। তাই ইসলাম ধর্মের গভীর আবেগ-অনুভূতির শিকড় থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণকে বিচ্ছিন্ন করতে হলে প্রয়োজন এমন একটি দর্শন যা মানুষকে ইসলাম ধর্মের কঠিন অনুশাসন মেনে চলার পথে নিরুৎসাহিত করে তুলবে। অপর দিকে তরুণ-যুবক শ্রেণীকে প্রলুব্ধ করবে এক বাঁধনহারা জীবনযাপনের ফাঁদে পা দিতে। ধীরে ধীরে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতি তরুণ-যুবক শ্রেণীকে বেপরোয়া আরাম-আয়েশ, ভোগপূর্ণ উচ্ছৃঙ্খল জীবনপদ্ধতির দিকে ঠেলে দিলেই তারা হয়ে পড়বে শিকড়হীন পরগাছার মতো। তাদের আবেগ-অনুভূতি সমাজের গভীরে প্রোথিত থাকবে না বলেই তারা হবে ভাসমান উচ্ছৃঙ্খল জনগোষ্ঠী। তখন তারা আর ইসলামের ঐতিহ্যে গর্ববোধ করবে না এবং ধর্মনিরপেতাবাদের জোয়ারে গা ভাসিয়ে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। কারণ তথাকথিত ধর্মনিরপেতাবাদ তরুণ-যুবকদেরকে ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে এবং ধর্মীয় অনুভূতি একবারেই মিটিয়ে দেয়। ধর্মনিরপেতাবাদ ধর্মহীনতারই লেবাসি নাম। ধর্মনিরপেতাবাদ হচ্ছে বস্তুভিত্তিক দর্শনের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গির আওতায় স্রষ্টা কিংবা পারলৌকিক কোনো শক্তির কোনো স্থান নেই, সুতরাং ধর্মেরও কোনো স্থান নেই। মুসলিম তরুণ যুবগোষ্ঠী এই নাস্তিকতাবাদী তত্ত্বে প্রভাবিত হলে তারা স্বেচ্ছায়ই ইসলামবিদ্বেষী হয়ে উঠবে এবং তাহলেই ভারতীয় শাসক চক্রের গোপন স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়ে যায়; অর্থাৎ বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ধর্মনিরপেতাবাদই হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি সুকৌশল ঠাণ্ডাযুদ্ধ। ভারত তাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ধর্মনিরপেতাবাদ জুড়ে দিয়ে মোটেও ভুল করেনি, অথবা নিছক ল্যহীনভাবেই ধর্মনিরপেতাবাদ জুড়ে দেয়নি।” কুরআন-সুন্নাহর গুরুত্ব আল্লাহ তায়ালা মহানবী সা:-এর ওপর কুরআন মজিদ নাজিল করে তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার যেমন তাগিদ দিয়েছেন, তদ্রƒপ এর যাবতীয় বিধিবিধান পালন অপরিহার্য করে দিয়েছেন। অবশ্য কুরআন মজিদে তা বাস্তবায়নের সবিস্তার বিবরণ দেননি। তিনি এর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তাঁর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ওপর। তিনি নিজের কথা, কাজ ও আচার-আচরণের মাধ্যমে কুরআনের আদর্শ কায়েমের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হাতে কলমে বুঝিয়ে দিয়েছেন। বলা বাহুল্য, হাদিসও এক প্রকার ওহি। এর প্রমাণ কুরআন মজিদেই রয়েছে :- ‘তিনি (নবী) সা: নিজের ইচ্ছামতো কোনো কথা বলেন না, যা বলেন তা সবই আল্লাহর ওহি’ (সূরা নাজম : ৩-৪)। নবী করিম সা: বলেছেন, ‘জেনে রাখো, আমাকে কুরআন দেয়া হয়েছে এবং তার সাথে তার অনুরূপ আরো একটি বস্তুও দেয়া হয়েছে’ (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)। মহানবী সা:-এর আনুগত্য করার জন্য আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত ভাষায় আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন :- ‘আর রাসূল তোমাদের যা দান করেন তা গ্রহণ করো এবং যা বারণ করেন, তা থেকে বিরত থাকো’ (সূরা হাশর : ৭)। লেখার শুরুতেই ওপার বাংলার ‘ধর্ম’ কর্তৃক শব্দদূষণের নামে ধর্মপালনকারীদের অযথা হয়রানি এবং এর ধরন দেখে মনে হয়, কৌশলে ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র ইসলাম এবং সেখানকার মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমাদের বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেতা নিয়ে যেসব অনুচ্ছেদ রচিত হয়েছে তা পরস্পরবিরোধী। ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে শুরু হওয়া সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণার পর প্রায় ৯০ ভাগ মুসলমানের এ দেশে যতই ধর্মনিরপেতার নামে ধর্মহীনতার প্রচার এবং প্রসারের চেষ্টা করা হোক তা বুমেরাং হতে বাধ্য। মেজর এম এ জলিল সংবিধানে ধর্মনিরপেতা সংযোজনের সুদূরপ্রসারী চক্রান্তকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। পৃথিবীর তাবৎ মুসলমানের হৃদয়ের গভীরে পবিত্র কুরআন এবং রাসূল সা:-এর হাদিসের আলোকচ্ছটা চিরঞ্জীব। অন্য ধর্মাবলম্বীরাও তাদের স্ব-স্ব ধর্ম নিয়ে আমাদের মতো গর্ববোধ করে থাকেন। রাষ্ট্রের উচিত সব ধর্মকে যথাসাধ্য উৎসাহিত করা। ধর্মই মানুষের জীবনের মহৎ গুণগুলো অর্জনের একমাত্র উৎস। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশিত জীবন ব্যবস্থাই প্রত্যেক মুসলমানের কাম্য। যাবতীয় চক্রান্ত থেকে আমাদের রাষ্ট্র এবং ঈমানদার মুসলমান নাগরিকদের মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন মুক্ত রাখেনÑ আমিন। kazi_sayed@yahoo.com
http://www.dailynayadiganta.com/welcome/post/11599#.Ugm0oW087IU
|| কাজী সাইদ ||
কলকাতা হাইকোর্ট ২১ নভেম্বর ১৯৯৬ সালে সব ধর্মের উপাসনালয়ে লাউড স্পিকার নিষিদ্ধ করে এক রুলিং জারি করেছিলেন। জাস্টিস ভগবতী প্রসাদ ব্যানার্জি ও জাস্টিস এ কে চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ তাদের রুলিংয়ে নির্দেশ দেন, যেহেতু ভারত একটি সেকুলার রাষ্ট্র; তাই ‘শব্দদূষণ’ নিয়ন্ত্রণের জন্য এ নিষেধাজ্ঞা সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর প্রযোজ্য। সে বছর ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় কলকাতার দমদম এয়ারপোর্টের এক নম্বর গেট সংলগ্ন মসজিদে এক মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয় যাতে লাউড স্পিকার ব্যবহৃত হয়েছিল। খবর পেয়ে স্টেট পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের কর্মকর্তারা সেখানে হাজির হন। তারা দেখতে পান মাইক সিস্টেমের শব্দের মাত্রা ৮৫ ডেসিবল। আদালত কর্তৃক নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৬৫ ডেসিবল। আদালত সেই মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন। ৩১ জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে মসজিদ কমিটিকে দোষী সাব্যস্ত করে ২৫০০ রুপি জরিমানা করেন এবং জরিমানার টাকা পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের হিসাবে জমা করতে নির্দেশ দেন। একই অপরাধে হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশ কিছু পূজা উদযাপন কমিটিকেও ১০০০ রুপি করে জরিমানা করা হয়। ৬ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু মুসলমান, শিখ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নেতাদের নিয়ে এক সভা করেন। তিনি তাদের হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে চলতে অনুরোধ করেন। এ সভায় মুসলিম সম্প্রদায়ের পে নাখোদা মসজিদের মাওলানা মোহাম্মদ সাব্বির, সোলানা মসজিদের মাওলানা মোহাম্মদ কাইউম এবং স্টেট ওয়াকফ বোর্ডের সদস্য মাওলানা মাসুদী অংশ নেন। মুসলিম ধর্মীয় নেতারা আজান প্রচারের জন্য লাউড স্পিকার ব্যবহারের অপরিহার্যতা ব্যাখ্যা করেন এবং প্রয়োজনে এ আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দেন, মসজিদের ওপর কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় হস্তপে সহ্য করা হবে না। মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কুরআন নিষিদ্ধকরণের দাবিতে চন্দমল চোপড়া, হেমাংশু কুমার চক্রবর্তী ও শীতল সিং ২৯ মার্চ ১৯৮৫ ভারতীয় সংবিধানের ২২৬ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। ১৭ মে জাস্টিস বিমল চন্দ্র মামলাটি খারিজ করে দেন। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম সর্বশেষ সংশোধনীসহ অক্টোবর ২০১১ সালে মুদ্রিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের শুরু হয়েছে:- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম (দয়াময়, পরম দয়ালু, আল্লাহর নামে)/পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে। এ বন্দনার পরেই রয়েছে প্রস্তাবনা। অনুচ্ছেদ ২(ক)তে বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।” সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘ধর্মনিরপেতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা’ প্রসঙ্গে অনুচ্ছেদ ১২তে বলা হয়েছে, “ধর্মনিরপেতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্বপ্রকার সাপ্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, (ঘ) কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার ওপর নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে।’’ সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ‘মৌলিক অধিকার’ অধ্যায়ে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:- অনুচ্ছেদ ৪১ (১) আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা-সাপেে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে; (খ) প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন, রণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রহিয়াছে। ৪১ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:- ‘কোনো শিাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানকারী কোনো ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মসংক্রান্ত না হইলে তাহাকে কোনো ধর্মীয় শিাগ্রহণ কিংবা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনালয়ে অংশগ্রহণ বা যোগদান করিতে হইবে না।’ আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের মুদ্রণ ও প্রকাশনা শাখা থেকে মুদ্রিত এ সংবিধানের শুরুতে সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদের ২০-১০-২০১১ এর একটি উপক্রমণিকা ছাপা হয়েছে। এতে তিনি দাবি করেছেন, ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধন) আইন, ২০১১-এর মাধ্যমে ১৯৭২ সালে গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত, সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ মূল চেতনা অর্থাৎ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেতা ও জাতীয়তাবাদ ফিরিয়া আসিয়াছে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পালনে সমান অধিকার ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করা হইয়াছে।’ মেজর জলিলের অভিমত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অকুতোভয় বীরসেনানী মেজর এম. এ. জলিল তার অরতি স্বাধীনতাই পরাধীনতা গ্রন্থে ’৭২ এর সংবিধানের মূল চারটি স্তম্ভ সম্পর্কে তীব্র সমালোচনা করেছেন। ‘আওয়ামী লীগের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির উৎস’ অধ্যায়ে তার বক্তব্য, ‘১৯৭০ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো ছয় দফার ভিত্তিতে। এই ছয় দফার মধ্যে আওয়ামী লীগ গৃহীত চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির একটিরও উল্লেখ ছিল না। তা ছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ আরও উল্লেখ করেছিল যে, তারা ইসলাম ধর্মবিরোধী কোনো আইনকানুনও পাস করবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ’৭২ সালের জানুয়ারিতে মতাসীন হওয়ার সাথে সাথেই ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে দেয় এবং গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেতা ও জাতীয়তাবাদের নামে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি নির্ধারণ করে, যা পরবর্তী সময়ে ’৭২ সালের রাষ্ট্রীয় সংবিধানেও সন্নিবেশিত করা হয়। এই চার মূলনীতির উৎস কোথায়? কেনই বা ওই চার নীতিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হলো? এ প্রশ্নগুলোর জবাব জনগণ আজো পায়নি। যে আওয়ামী লীগ ‘১৯৭০ সালের নির্বাচনে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী কোনো আইন পাস না করার প,ে সেই আওয়ামী লীগই ভারত থেকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গুটিয়ে নিয়ে এসে মতার মসনদে বসার সাথে সাথেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করল কেন? স্বেচ্ছাচারমুক্ত হতে পারল না কেন? দেশের জনমতের কোনোরূপ তোয়াক্কা না করেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব জনগণের ওপর জবরদস্তিভাবেই চাপিয়ে দিলো।’ তার বক্তব্য, ‘১৯৭০ সালে নির্বাচন ছিল পাকিস্তান কাঠামোর আওতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচন। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদসদস্যরা জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করেছিল পাকিস্তানের অধীনে, নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অধীনে নয়। সুতরাং ’৭২ এ আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংবিধান প্রদান নীতিগত দিক দিয়ে মোটেও বৈধ ছিল না।’ তার ভাষায়, ‘‘১৯৭২-এর আওয়ামী লীগের এমন কোনো বৈধ অধিকার ছিল না, যাতে করে তারা দেশ ও জাতির ওপর একটি মনগড়া সংবিধান আরওপ করতে পারে। তবুও তারা তা জবরদস্তি করেছে। দেশের জনগণের চিৎকার, প্রতিবাদ কোনো কাজেই আসেনি। এটা তাদের দুঃসাহস কিংবা ঔদ্ধত্য ছিল না, আওয়ামী লীগের এই আচরণ ছিল মুরব্বির আদেশ-নির্দেশ পালন করার বাধ্যবাধকতা। কারণ এ কথা সর্বজনবিদিত যে, বাংলাদেশের ’৭২ এর সংবিধানের মূল প্রেরণা ভারতের সেকুলার সংবিধান। ’৭২-এর সংবিধানের উৎস তাই বাংলাদেশের জনগণ নয়, সম্প্রসারণবাদী এবং সাম্প্রদায়িক ভারতীয় শাসকচক্রই হচ্ছে এর মূল উৎস।” সংবিধানে ধর্মনিরপেতা স্থাপনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মেজর জলিলের বক্তব্য, “বাংলাদেশের মূল সংস্কৃতি হচ্ছে ইসলামভিত্তিক, কারণ ইসলামই হচ্ছে শতকরা ৯০ ভাগ জনগণের ধর্ম এবং এই ধর্মকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক জীবন। তাই ইসলাম ধর্মের গভীর আবেগ-অনুভূতির শিকড় থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণকে বিচ্ছিন্ন করতে হলে প্রয়োজন এমন একটি দর্শন যা মানুষকে ইসলাম ধর্মের কঠিন অনুশাসন মেনে চলার পথে নিরুৎসাহিত করে তুলবে। অপর দিকে তরুণ-যুবক শ্রেণীকে প্রলুব্ধ করবে এক বাঁধনহারা জীবনযাপনের ফাঁদে পা দিতে। ধীরে ধীরে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতি তরুণ-যুবক শ্রেণীকে বেপরোয়া আরাম-আয়েশ, ভোগপূর্ণ উচ্ছৃঙ্খল জীবনপদ্ধতির দিকে ঠেলে দিলেই তারা হয়ে পড়বে শিকড়হীন পরগাছার মতো। তাদের আবেগ-অনুভূতি সমাজের গভীরে প্রোথিত থাকবে না বলেই তারা হবে ভাসমান উচ্ছৃঙ্খল জনগোষ্ঠী। তখন তারা আর ইসলামের ঐতিহ্যে গর্ববোধ করবে না এবং ধর্মনিরপেতাবাদের জোয়ারে গা ভাসিয়ে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। কারণ তথাকথিত ধর্মনিরপেতাবাদ তরুণ-যুবকদেরকে ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে এবং ধর্মীয় অনুভূতি একবারেই মিটিয়ে দেয়। ধর্মনিরপেতাবাদ ধর্মহীনতারই লেবাসি নাম। ধর্মনিরপেতাবাদ হচ্ছে বস্তুভিত্তিক দর্শনের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গির আওতায় স্রষ্টা কিংবা পারলৌকিক কোনো শক্তির কোনো স্থান নেই, সুতরাং ধর্মেরও কোনো স্থান নেই। মুসলিম তরুণ যুবগোষ্ঠী এই নাস্তিকতাবাদী তত্ত্বে প্রভাবিত হলে তারা স্বেচ্ছায়ই ইসলামবিদ্বেষী হয়ে উঠবে এবং তাহলেই ভারতীয় শাসক চক্রের গোপন স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়ে যায়; অর্থাৎ বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ধর্মনিরপেতাবাদই হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি সুকৌশল ঠাণ্ডাযুদ্ধ। ভারত তাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে ধর্মনিরপেতাবাদ জুড়ে দিয়ে মোটেও ভুল করেনি, অথবা নিছক ল্যহীনভাবেই ধর্মনিরপেতাবাদ জুড়ে দেয়নি।” কুরআন-সুন্নাহর গুরুত্ব আল্লাহ তায়ালা মহানবী সা:-এর ওপর কুরআন মজিদ নাজিল করে তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার যেমন তাগিদ দিয়েছেন, তদ্রƒপ এর যাবতীয় বিধিবিধান পালন অপরিহার্য করে দিয়েছেন। অবশ্য কুরআন মজিদে তা বাস্তবায়নের সবিস্তার বিবরণ দেননি। তিনি এর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তাঁর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ওপর। তিনি নিজের কথা, কাজ ও আচার-আচরণের মাধ্যমে কুরআনের আদর্শ কায়েমের বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হাতে কলমে বুঝিয়ে দিয়েছেন। বলা বাহুল্য, হাদিসও এক প্রকার ওহি। এর প্রমাণ কুরআন মজিদেই রয়েছে :- ‘তিনি (নবী) সা: নিজের ইচ্ছামতো কোনো কথা বলেন না, যা বলেন তা সবই আল্লাহর ওহি’ (সূরা নাজম : ৩-৪)। নবী করিম সা: বলেছেন, ‘জেনে রাখো, আমাকে কুরআন দেয়া হয়েছে এবং তার সাথে তার অনুরূপ আরো একটি বস্তুও দেয়া হয়েছে’ (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)। মহানবী সা:-এর আনুগত্য করার জন্য আল্লাহ তায়ালা নিম্নোক্ত ভাষায় আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন :- ‘আর রাসূল তোমাদের যা দান করেন তা গ্রহণ করো এবং যা বারণ করেন, তা থেকে বিরত থাকো’ (সূরা হাশর : ৭)। লেখার শুরুতেই ওপার বাংলার ‘ধর্ম’ কর্তৃক শব্দদূষণের নামে ধর্মপালনকারীদের অযথা হয়রানি এবং এর ধরন দেখে মনে হয়, কৌশলে ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র ইসলাম এবং সেখানকার মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আমাদের বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেতা নিয়ে যেসব অনুচ্ছেদ রচিত হয়েছে তা পরস্পরবিরোধী। ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে শুরু হওয়া সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণার পর প্রায় ৯০ ভাগ মুসলমানের এ দেশে যতই ধর্মনিরপেতার নামে ধর্মহীনতার প্রচার এবং প্রসারের চেষ্টা করা হোক তা বুমেরাং হতে বাধ্য। মেজর এম এ জলিল সংবিধানে ধর্মনিরপেতা সংযোজনের সুদূরপ্রসারী চক্রান্তকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। পৃথিবীর তাবৎ মুসলমানের হৃদয়ের গভীরে পবিত্র কুরআন এবং রাসূল সা:-এর হাদিসের আলোকচ্ছটা চিরঞ্জীব। অন্য ধর্মাবলম্বীরাও তাদের স্ব-স্ব ধর্ম নিয়ে আমাদের মতো গর্ববোধ করে থাকেন। রাষ্ট্রের উচিত সব ধর্মকে যথাসাধ্য উৎসাহিত করা। ধর্মই মানুষের জীবনের মহৎ গুণগুলো অর্জনের একমাত্র উৎস। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশিত জীবন ব্যবস্থাই প্রত্যেক মুসলমানের কাম্য। যাবতীয় চক্রান্ত থেকে আমাদের রাষ্ট্র এবং ঈমানদার মুসলমান নাগরিকদের মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন মুক্ত রাখেনÑ আমিন। kazi_sayed@yahoo.com
http://www.dailynayadiganta.com/welcome/post/11599#.Ugm0oW087IU